আইসিসিবি আয়োজিত অনুষ্ঠানে বক্তারা

প্রতিবেশী দেশের সহায়তা ছাড়া আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে এগোনো সম্ভব নয়

বর্তমান বিশ্বের অধিকাংশ দেশ বাণিজ্যের মাধ্যমে সমৃদ্ধ হচ্ছে।

এক্ষেত্রে প্রতিবেশী দেশগুলোর সহায়তা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর ভাগ্য অনেক সময় ভৌগোলিক অবস্থান দিয়ে নির্ধারিত। যেকোনো দেশের রাজনীতি নিজের মতো করে চলতে পারে, তবে ব্যবসা-বাণিজ্যের ক্ষেত্রে দূরের দেশগুলোর চেয়ে প্রতিবেশীর ভূমিকা অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। তাদের সহায়তা ছাড়া আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে এগোনো সম্ভব নয়।

রাজধানীর একটি হোটেলে গতকাল ‘মেড ইন নেপাল: লেসনস ইন বিজনেস বিল্ডিং ফ্রম দ্য ল্যান্ড অব এভারেস্ট’ শীর্ষক বইয়ের মোড়ক উন্মোচন অনুষ্ঠানে এ কথা বলেন বক্তারা। বইটি লিখেছেন নেপালের ব্যবসায়ী ও সিজি-কর্প গ্লোবালের চেয়ারম্যান বিনোদ কে চৌধুরী। ইন্টারন্যাশনাল চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি বাংলাদেশ (আইসিসিবি) এ অনুষ্ঠানের আয়োজন করে।

অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ক মন্ত্রী আবদুল আউয়াল মিন্টু। তিনি বলেন, ‘নেপাল ও বাংলাদেশের মতো দেশগুলোয় সাম্প্রতিক তরুণদের আন্দোলন নিয়ে গবেষণা হওয়া দরকার। আমার মনে হয়, কর্মসংস্থানের অভাব ও সমাজে বৈষম্যের কারণেই তরুণরা আন্দোলনে নেমেছে।’

তিনি আরো বলেন, ‘বৈষম্য ও দারিদ্র্য কমানোর মূল বিষয় হলো কর্মসংস্থান সৃষ্টি। এজন্য বিনিয়োগ প্রয়োজন। আর বিনিয়োগ আনতে হলে এমন একটি পরিবেশ দরকার, যেখানে বিনিয়োগকারীরা নিজেদের নিরাপদ মনে করবেন। এ পরিবেশের সঙ্গে আইনের শাসন, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি ও শান্তিপূর্ণ সমাজের মতো মৌলিক বিষয়গুলো জড়িত। দুর্ভাগ্যজনকভাবে আমাদের দেশে এসবের ঘাটতি রয়েছে। আর এসব বিষয় ব্যবসায়ীদের ওপর নয়; বরং রাজনীতির ওপর নির্ভর করে। রাজনীতি ও অর্থনীতি যমজ ভাইয়ের মতো; একটি আরেকটিকে ছাড়া বিকশিত হতে পারে না। আমরা এ দুইয়ের মধ্যে সমন্বয় করতে পারিনি।’

উন্মোচিত বইয়ের কথা উল্লেখ করে আবদুল আউয়াল মিন্টু বলেন, ‘ভবিষ্যতের জন্য নেতৃত্ব ও ঝুঁকি কীভাবে নিতে হয়, এ বইয়ে সে বিষয়গুলো উঠে এসেছে। বইটি সম্ভবত অর্থনীতি ও রাজনীতির মধ্যে যে দ্বন্দ্ব রয়েছে, তা কীভাবে কমানো যায়; সে বিষয়েও কিছু প্রশ্নের উত্তর দেবে। আমাদের দারিদ্র্য ও বৈষম্য কমাতে হলে ভালো রাজনীতি দরকার। কারণ অর্থনীতি যতই বৃদ্ধি পাক, জিডিপি যতই বাড়ুক, উৎপাদন ও উৎপাদনশীলতা যতই বাড়ুক; অর্থাৎ আমরা যতই সম্পদ সৃষ্টি করি না কেন, এ সম্পদের বণ্টন ব্যবসায়ীদের ওপর নির্ভর করে না। বরং তা পুরোপুরি নির্ভর করে রাজনীতি ও রাজনীতিবিদদের ওপর।’

সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রী বলেন, ‘যদি সমাজের উন্নতি ও দেশকে সমৃদ্ধ করতে চান, তাহলে আপনাকে প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে বাণিজ্য করতে হবে। আপনার কাছে হয়তো কিছু কাঁচামাল বা খনিজ সম্পদ থাকতে পারে, কিন্তু প্রতিবেশীদের সঙ্গে বাণিজ্য ছাড়া তা দিয়ে দীর্ঘমেয়াদে সমৃদ্ধি সম্ভব নয়। আজকের বিশ্বে অধিকাংশ দেশ বাণিজ্যের মাধ্যমে সমৃদ্ধ হচ্ছে, প্রাকৃতিক সম্পদের ওপর নির্ভর করে নয়। তা না হলে আফ্রিকার অনেক দেশই আজ অত্যন্ত সমৃদ্ধ হতো, কারণ সেখানে প্রচুর খনিজ সম্পদ রয়েছে।’

অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি ছিলেন বাংলাদেশে নিযুক্ত নেপালের রাষ্ট্রদূত ঘনশ্যাম ভান্ডারী। তিনি বলেন, ‘ব্যবসা গড়ে তুলতে গেলে রাজনীতিবিদ, সহকর্মী ও অংশীদারদের সঙ্গে কঠিন কিন্তু সৎ আলোচনা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। রাজনীতি, প্রশাসন বা ব্যবসা—যেকোনো ক্ষেত্রেই সহানুভূতি থাকতে হয়। আমার বিশ্বাস, নেপাল ও বাংলাদেশের ব্যবসায়ীদের মধ্যে সে সহানূভূতি রয়েছে। কারণ উভয় দেশের মধ্যে সম্পর্ক অত্যন্ত বন্ধুত্বপূর্ণ ও আন্তরিক। এ অবিচ্ছেদ্য সম্পর্ক আমাদের জনগণ, ব্যবসায়ী সমাজ ও রাজনৈতিক নেতৃত্বের মধ্যেও প্রতিফলিত হয়। আমরা প্রায়ই বলি, নেপাল ও বাংলাদেশের সম্পর্ক হিমালয় ও বঙ্গোপসাগরের সম্পর্কের মতোই প্রাকৃতিক এবং অর্গানিক। এ সম্পর্কের মাধ্যমেই আমরা অংশীদারত্ব ও প্রকৃত বন্ধুত্ব গড়ে তুলি।’

আঞ্চলিক সহযোগিতা পুনরুজ্জীবিত করতে ব্যবসায়ী সম্প্রদায়ের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে বলে মনে করেন বাংলাদেশের সাবেক রাষ্ট্রদূত ফারুক সোবহান। অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, ‘ভূরাজনৈতিক ও ভূ-অর্থনৈতিক দিক থেকে নেপাল ও বাংলাদেশ এখন সম্ভবত তাদের ইতিহাসের অন্যতম কঠিন সময় এবং সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। উপসাগরীয় অঞ্চলের সংঘাত আমাদের জন্য বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে। কারণ সেখানে আমাদের উভয় দেশের বিপুলসংখ্যক শ্রমিক কাজ করেন। এছাড়া বাণিজ্য, পর্যটন ও জ্বালানি সংকট তো আছেই। এসব মোকাবেলায় আঞ্চলিকভাবে একসঙ্গে কাজ করার বিষয়গুলো ভাবতে হবে।’

অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন ‘মেড ইন নেপাল’ বইয়ের লেখক ও ব্যবসায়ী বিনোদ কে চৌধুরী। ফোর্বস সাময়িকীর তালিকা অনুসারে তিনি নেপালের একমাত্র বিলিয়নিয়ার বা শতকোটিপতি। যুক্তরাষ্ট্র, থাইল্যান্ড, ফিলিপাইন, ভারত, বাংলাদেশ, মালদ্বীপ, শ্রীলংকা, সার্বিয়াসহ ৩০টির বেশি দেশে ব্যবসা আছে তার।

নেপালভিত্তিক চৌধুরী গ্রুপের কর্ণধার বিনোদ কে চৌধুরীর ব্যবসা সেবা, শিল্প, জ্বালানি, টেলিযোগাযোগ, আর্থিক খাত, ভোগ্যপণ্য ও পর্যটনসহ নানা খাতে সম্প্রসারিত হয়েছে। একসময় তিনি দেশটির সংসদ সদস্যও ছিলেন। বইটির মোট ১৩টি অধ্যায়ে তিনি তার ব্যবসায়িক যাত্রা, রাজনৈতিক অধ্যায় ও সাম্প্রতিক তরুণদের আন্দোলনসহ নিজের জীবনের নানা বিষয় তুলে ধরেছেন।

অনুষ্ঠানে বিনোদ কে চৌধুরী বলেন, ‘আন্তঃসহযোগিতার নতুন দিগন্ত উন্মোচন করতে পারে নেপাল ও বাংলাদেশ। ভৌগোলিক কারণেই আমাদের ভাগ্য অনেক ক্ষেত্রে নির্ধারিত। নিঃসন্দেহে নেপাল বাংলাদেশের সঙ্গে আরো বৃহত্তর অর্থনৈতিক সম্পৃক্ততায় এগিয়ে যেতে চায়। কিন্তু ভারত ইতিবাচক ভূমিকা না রাখলে তা সম্ভব হবে না। আমাদের দ্বিপক্ষীয় ও ত্রিপক্ষীয় সম্পর্ক গড়ে তুলতে হবে। নেপাল ও বাংলাদেশকে একসঙ্গে এগিয়ে আসতে হবে এবং সে প্রেক্ষাপটে ভারত একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হবে।’

অনুষ্ঠানে সভাপতির বক্তব্যে আইসিসিবির সভাপতি মাহবুবুর রহমান বলেন, ‘দক্ষিণ এশিয়ার মানুষের আশা ও আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে বিনোদ কে চৌধুরীর বইটি গভীরভাবে সম্পর্কিত। তার সাফল্যের গল্প প্রমাণ করে যে সঠিক দৃষ্টিভঙ্গি ও মানসিকতা থাকলে এ অঞ্চলের ব্যবসাগুলোও বিশ্ববাজারে প্রতিযোগিতা, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং অর্থনৈতিক উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। সরবরাহ ব্যবস্থার ব্যাঘাত, আর্থিক অস্থিরতা বা জলবায়ু পরিবর্তনের চ্যালেঞ্জের কারণে বর্তমানে আমাদের অর্থনীতি যখন বৈশ্বিক অনিশ্চয়তার মুখোমুখি, তখন এ ধরনের সফলতার গল্প আমাদের জন্য দিকনির্দেশনা ও অনুপ্রেরণা হিসেবে কাজ করে।’

অনুষ্ঠানে আরো উপস্থিত ছিলেন আইসিসিবির সহসভাপতি নাসের এজাজ বিজয় ও কার্যনির্বাহী সদস্য কুতুবুদ্দিন আহমেদ, বাংলাদেশ চেম্বার অব ইন্ডাস্ট্রিজের (বিসিআই) সভাপতি আনোয়ার-উল-আলম চৌধুরী, উত্তরা গ্রুপ অব কোম্পানিজের চেয়ারম্যান মতিউর রহমান, ঢাকা চেম্বারের সাবেক সভাপতি রিজওয়ান রাহমান প্রমুখ।

আরও